গল্পটা আমার মায়ের

প্রকাশিত: ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৮, ২০২১
print news

আমার মা। বাংলার চির বধূদের একজন। ১৯৯৪ সালে আমার জন্ম।

১৯৯২ সালে আমার মায়ের বিয়ে হয়। ৯৪ এর এক তূফানের দিনে আমার জন্ম হয়ে কক্সবাজারের রামু উপজেলার পূর্ব ধেছুয়া পালং গ্রামে। মা বলেছে আমার জন্মের দিন আমাদের গ্রামের দক্ষিণের পাহাড়ে আরেক মা মরেছেন মর্মান্তিকভাবে। গর্ভবতী সে মা তাঁর বাচ্চাসহ পিষ্ট হয়েছেন ঝড়ের আঘাতে শিকড়সহ উপড়ে পড়া বিশাল গর্জন গাছের তলে।

কি ভাগ্য আমার! সেদিনই আমার জন্ম। না জানি কত মা ছেলে এভাবে সারাদেশে প্রাণ হারায় সে বছর। শুধু কি সে বছর। ফি বছরে এমন কান্ড ঘটে।

গল্পটা আমার মায়ের। আমার মা। মাগো, মা। আমার নাড়ি, নক্ষত্র। আমার সুন্দরী মা। মা বলতেন, ১২ বছর বয়সে যেদিন মা বউ হয়ে আসেন, সেদিনই তিনি শ্বশুরবাড়িতে কারো কারো মাথা ব্যাথার কারণ হয়। কারণ আমার দাদু মা কে এক ঝলক দেখে ছেলের বউ করে আনেন। সে থেকে শুরু বঞ্চনা, নিপীড়ন, শোষণের।

মা যখন সেই অল্প বয়সে রান্না করতেন তখন ভাতে চুল দিত আমার ফুফিরা। দাদা এগুলো দেখে মা কে ঘৃণা করা শুরু করেন। শ্বশুর বাড়িতে আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই মা কে বিয়ের সময় দেওয়া ৬ আনা স্বর্ণ দাদু নিয়ে বিক্রি করে দেন। সেই যে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বন্ধক দিয়েছিল আজও সে সোনা পায়নি।

দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে আমি আসি দুনিয়ায়। আমার মায়ের চোখে অশ্রু। খুশি ঝলমল হয়তো চেহারা। ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। মায়ের কোল জুড়ে আমি। পুরো সংসারে আমার রাজত্ব। ৫ বছর পর মা যখন ঊনিশে তখন আমাকে প্রথম মা আমার দুষ্টুমির কারণে আমাকে বাঁশের ডগা দিয়ে আঘাত করে। সে আঘাতে দাদু মাকে নানু বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আমি দাদু র সাথে থাকি। আমার নানা ছিল না। মা বলতেন মা যখন ৫ বছর বয়সী তখন নানু মারা যায়। অভাবী নানী ৭ টি মেয়ে, ২ টি ছেলের বিয়ে দিতে নাকানি চুবানি খেয়েছে। মা শৈশবে রাখালের মত গরু চরাতেন। আমার শিশু মা কিছুই জানতেন না সমাজ, সংস্কৃতি, আচার, সভ্যতা।সেই দুঃখিনী মা ছেলেকে মারার অপরাধে ৬ মাস বাপের বাড়িতে। আজ যদি মনে পড়ে সে কথা কষ্ট হয় খুব। মনে হয় আমার মাকে যদি তখন নিয়ে আসতে পারতাম আমার কাছে। মা বাড়ির ওঠোনে সবজি, শাক চাষ লাগাত। বড় হলে সেগুলো বেঁচতে পাঠাত দোকানে। ঐ টাকায় আমি বাগগুলা কিনে খেতাম। কাপড় কিনতাম।

আজ আমার বয়স ২৭ বছর। ২৭ বছরে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে কখনোই দেখিনি মা খুব সুখী ছিল। পানের বরজ থেকে শুরু করে ধান, সবজি চাষ, ঘর তৈরি সব কিছুতেই আমার মায়ের শ্রম আছে। বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটায় তৈরি আমাদের ৪ ভাই বোনের সংসার। আরো ২ ভাই মরা জন্ম নিয়েছে। হয়তো আমার শিশু মা তাঁর শরীর দিয়ে সক্ষম হননি তাদের বুকে ধরে রাখতে।

মাগো, মা। আমায় ক্ষমা করো। আমি তোমাকে এখনো কিছু দিতে পারিনি। আমি জগত সংসারের দুর্বল মানুষগুলো যেন তোমার মত কষ্টের শিকার না হতে হয় তার জন্য কাজ করছি।

কৈশোরে দেখি আমার মা কে বাবা যেকোন কারণে খুব বকে। সাথে যোগ দেয় দাদা, দাদী, ফুফি, পাড়া পড়শী রা। মা শুধু কাঁদে। মুরগীর বাসার সামনে যে মাটির উচুঁ ডিবি, তার ওপর বসে শুধু কাঁদে।

যতবার বাবা মাকে মারে, ততবার আমার কলিজা ফেটে কান্না বেরুত। আমি ফুফিঁয়ে ফুফিঁয়ে কাঁদতাম মার সাথে। জড়িয়ে ধরতাম। বুঝতাম না কেন এমন করে বাবা।

আমার বাবা আমার জীবন গড়েছেন যিনি। বাবা আমার মনে হয় জন্ম থেকেই কাজ করে। সমাজ তাঁকে কিছু দেইনি। বদরাগ ছাড়া। বাবা আমার সহজ সরল। অতি গর্জে, কখনো অতি বর্ষে। সারাদিন শ্রম দিয়ে সে টাকায় বাজার সওদা করে বাড়ি ফেরে।

চারপাশের কানাকানি, ফিসফিসানি দিনশেষে গিয়ে পড়ে মায়ের ওপর।

বাপ ভক্ত বাবা। পাড়া পড়শীর সাথে মিলেমিশে থাকতে গিয়ে কত মার আমার মায়ের কপালে জুটেছে তা বলতে পারিনা।

মার চলতে থাকে। একটু ভুল করলেই মার, গালি, চড়, থাপ্পড়, লাথি।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আমি বড় হই। বই পড়ি। ভালো রেজাল্ট করি। পরিচিতি পাই। দুনিয়াকে জানি। অভাব-অনটন আর সুখ-দুঃখের খেলা চলে।

একদিন ঘর পুরে দেয় প্রতিবেশীরা। হিজরত করি। দুর্গম পাহাড়ে চলে যায়। সে পাহাড় কেটে আবাদ করে ঘর তৈরি হয়। বরজ তৈরি হয়। ফল-ফসল উৎপাদন হয়। কোন কিছুতেই বাবার চেয়ে কম যায় না মা।

বরং বেশিই যায়। রান্না, বাড়ির কাজ, মাঠের কাজ সব করে মা, সব করে। মাগো মা,। কি করে তোমার ঋণ শোধ করব মা।

যৌবনে মার প্রতি বাবার আচরণ বরাবরই থাকে। মন বিষিয়ে ওঠে। তারপর একদিন। গর্জে ওঠি বাঘের মত। সেদিন সকলে স্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ কেউ পালানোর পথ খুঁজে। বাবা অবাক হয়ে যায়। দাদা বলে আমি মার ছেলে, বাবার ছেলে নয়।

আমি বলি, আজ আমি বলব তোমরা শুনবে। আজকের পর যদি ভিতরের বাহিরের কোন দিক থেকে যে কেউ মারে একটা শব্দও বলেছ, তাহলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। যেই হাত ওঠবে সে হাত আমি কেটে নেব।

তারপর কিছুদিন শুনিনি মার কষ্ট।

এখন দূরে থাকি। মা থাকে গ্রামে। এখনও মাঝে মাঝে সে কান্ড ঘটে। পাশের বাড়ির এক নারীর সাথে বাবার সম্পর্কের কথা বলে মা প্রতিদিন কাঁদে। আমি বলি মা বাদ দাও। রাগ করে নানু বাড়ি চলে গিয়েছিল মা এক বছর। সেটি সমাধান করতে গিয়ে জীবন থেকে এক বছর ইয়ার লস হল।

সেদিন শুনি বাবার লাথিতে মার কোমরের এক পাশে বড় আঘাত হয়েছে। কোমরের রগ একটা আরেকটার ওপর ওঠেছে। বাবা ডাক্তারও দেখাচ্ছেন। খালার কাছ থেকে পরে শুনি মার তলপেটে আঘাত হয়েছে। রক্ত যাচ্ছে। মা বলেনি আমায়। সে রাত ঘুমাতে পারিনি।

ঝড়ের রাতে বিলের মাঝখানে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদি। খোদাকে বলি একি অনাচার চলছে তোমার দুনিয়ায়। হয় আমায় শক্তি দাও, নয়তো তুলে নাও। এ আমার আর সহ্য হয় না।

মা’র সাথে ফোনে কম কথা হয়। এখনও মার জন্য কাঁদি। মা বাড়ি যেতে বলে আমি যায় না। অভিযোগ এর ফুলঝুরি শুনতে ভালো লাগে না বলে। ভাবি আমার মা এসব সহ্য করে কিভাবে থাকে।

এখনও প্রতি রাত কাঁদি। বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। সারারাত ভাবি কি করা যায়, কি করব। চারপাশে সব এভাবেই চলছে। এখন আমি কর্মী। নারীর অধিকার এর কথা আমি বলি। আমার ওপর অনেক দায়িত্ব। কিন্তু কি করতে পারছি নিজের ঘরে।

কিছুদিন আগে একমাত্র বোনের বিয়ে হল। সুন্দরী হওয়াটাই তার স্কুলে যেতে বাধা। দু সন্তানের মা। এইতো সেদিন শুনলাম স্বামী তাকে মেরেছে।
বকা দিতে চাইতেই আবার নিষেধ করল, “থাক, ভাইয়া কিছু বলিস না।”

চলছে সবকিছু, আগের মতই। পুঁজির স্রোতে নারী যেন ভোগ্যপণ্য। কালো হাতের থাবায় প্রাণ যেন যায় যায় অবস্থা।

গত ভোটের পরে দশ জন মিলে এক নারীকে ঘর থেকে নিয়ে ধর্ষণ করল বিপক্ষ প্রার্থীকে ভোট দেয়ার অপরাধে। আমিও মশাল হাতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু সমস্যার ঢামাঢোলে সব হারিয়ে গেছে।

আমি বিয়ে করলাম। দু বছর হল। চলছে সুখের সংসার। একটু আধটু অভিমান রাগ তো হয়ই। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবার চরিত্রে বদলে যাচ্ছি।

ওহ একটা কথা বল হয়নি। যাকে নিয়ে এ লেখা সে আমার মা। আমার মা- শামসুন্নাহার। মানে সূর্য আর ঝর্ণা। দেদীপ্যমান ও সদা বহতা নদীর মত মা।


মোহাম্মদ ইলিয়াছ

সমাজকর্মী
২৭ নভেম্বর, ২০২১
কক্সবাজার